নব্বই দশকের শেষ দিকে বিটিভিতে প্যাকেজ নাটকের ঢল নামে। তখনকার গল্পে পরিবার ছিল কেন্দ্রবিন্দু—বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়–স্বজনের টানাপোড়েনই টেনে রাখত দর্শককে। তাই হয়তো ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘সংশপ্তক’, ‘আজ রবিবার’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সকাল-সন্ধ্যা’, ‘বন্ধন’ বা ‘রূপনগর’-এর মতো ধারাবাহিকগুলো আজও মানুষের মনে গাঁথা।
পারিবারিক গল্পের সেই শক্ত ভরসার ওপর টিকে ছিল ধারাবাহিক নাটকের জনপ্রিয়তা। দীর্ঘ সময় এই ঘরানার আধিপত্য ছিল। পরে হঠাৎ মোড় ঘুরে গেল—টেলিভিশন ভরতে শুরু করল প্রেমকেন্দ্রিক নাটক। নায়ক-নায়িকার রোমান্সের বাইরে খুব কম চরিত্রই জায়গা পেত। এতে অনেক অভিজ্ঞ ও গুণী অভিনেতা নিয়মিত কাজ হারাতে লাগলেন। একই সময়ে কমেডি নাটকের ছড়াছড়িও দেখা গেল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একক নাটকে আগের মতো পরিবর্তন না এলেও ধারাবাহিকে আবার ফিরে এসেছে পারিবারিক গল্পের শক্ত উপস্থিতি।
৫ নভেম্বর থেকে প্রচারিত হচ্ছে সিনেমাওলার প্রযোজনায় পারিবারিক ধারাবাহিক ‘এটা আমাদেরই গল্প’। মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত নাটকটি ইতোমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একই প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত আরেকটি পারিবারিক ধারাবাহিক ‘দেনা-পাওনা’ও দর্শকরা সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ধারাবাহিক নাটকেও পরিবারের উপস্থিতি বেড়েছে। যেমন, বিটিভিতে চলছে ‘ধূসর প্রজাপতি’, মাছরাঙায় ‘শাদী মোবারক’, দীপ্ত টিভিতে ‘রূপনগর’, এনটিভিতে ‘৭ কিলো ১ গ্রাম’।
পারিবারিক গল্পে জনপ্রিয়তা পাওয়া নাটকের মধ্যে ‘মামার বাড়ি’, ‘আত্মীয়’, ‘একান্নবর্তী’, ‘তোমাদের গল্প’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘বাবাও মানুষ’ উল্লেখযোগ্য। এগুলো কয়েক মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে ইউটিউবে। দর্শকদের অধিকাংশ মন্তব্যই প্রশংসাসূচক।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণ নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, পরিচালকরা সব বাজেট দু-একজন শিল্পীর পিছনে খরচ করে ফেলেন আর বলেন বাজেট নেই, তাই সিনিয়র শিল্পী নেওয়া যায় না। তারা এও অভিযোগ করেন, প্রবীণ শিল্পীদের নিলে নাটক চলে না, তাই তাদের নিয়ে গল্প চিন্তা করা হয় না।
বর্ষীয়ান অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটা কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বানাচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। মূলত ট্রেন্ড থেকে তারা এটা বানাচ্ছে। এই মুহূর্তে দর্শক পছন্দ করছে, তাই সবাই ওই দিকেই ঝুঁকেছে।’
বর্তমানে পারিবারিক গল্পের নাটকের যে জোয়ার চলছে, সেটি শুরু হয়েছিল মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের হাত ধরে। তার নির্মিত ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’ ধারাবাহিকটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরই আবার নতুন করে পারিবারিক গল্পে নাটক নির্মাণের হিড়িক পড়ে। তিনি নির্মাতা-অভিনয়শিল্পীদের এ অভিযোগের জবাব দেন।
রাজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্যদের কথা জানি না, আমি সবসময়ই এধরনের গল্প বানাতে চেয়েছি। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, আমার অধিকাংশ গল্প কিন্তু পারিবারিক বন্ধন কিংবা ক্রাইসিসের গল্প।’
বাজেট কিংবা স্পন্সর না পাওয়ার ব্যাপারে রাজ বলেন, ‘আমি নাটক নির্মাণের আগে স্পন্সরদের কাছে আমার পরিকল্পনা উপস্থাপন করি। তারা কখনো বলেনি, পারিবারিক গল্পের জন্য স্পন্সর দেব না।’
দায়বদ্ধতার ব্যাপারে রাজের সোজাসাপ্টা জবাব, ‘আমি তিন কারণে এধরনের গল্প নির্মাণ করি। দায়বদ্ধতা তো আছেই। কারণ, পরিবার ছাড়া গল্প হয় না। আর অন্য দুটো কারণ হচ্ছে—দর্শক পছন্দ করে এবং আমি নিজেও এধরনের গল্প বলতে পছন্দ করি।’


