ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধ করতে হলে এর বিচার অনিবার্য বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গুমের বিচার হলে রাষ্ট্র শিখবে যে, তার নাগরিকদের অদৃশ্য করা যায় না। আর বিচার না হলে ফ্যাসিবাদের অনুগত বাহিনী শিখে নেবে, মানুষকে গুম করা সম্ভব।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) সংঘটিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এদিন মামলার শুনানি গ্রহণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরু হয়।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের অপরাধের বিচার কেবল অতীতের দায় মোচনের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রতিজ্ঞা। আজ আমরা শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজছি না, আমরা মানবিকতার সেই সীমারেখা খুঁজছি, যা এই অপরাধগুলোর মাধ্যমে বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে।’
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে বলপূর্বক গুম একটি পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। একজন ব্যক্তিকে অপহরণ থেকে শুরু করে মুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রে গুমের স্থাপনা, নথিপত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রসিকিউশন জেআইসিতে গুমের শিকার হয়ে পরবর্তীতে ফিরে আসা ভিকটিমদের সাক্ষ্যের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করছে। তাজুল ইসলাম জানান, যেখানে সাক্ষ্যপ্রমাণ ধ্বংস করা হয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক আদালতগুলো কীভাবে বলপূর্বক গুমের বিচার করেছে, সেই নজিরও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, গুমের ঘটনাগুলো শুধু কিছু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার একটি কৌশল। বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষকে গোপনে হত্যা না করে, বরং দীর্ঘদিন অন্ধকার ও আলো-বাতাসহীন কুঠুরিতে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম করে তোলা হয়েছিল।
এই প্রক্রিয়ায় সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার একটি স্থায়ী পরিবেশ তৈরি হয় বলে দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর। তার মতে, এই ক্ষত শুধু রাজনৈতিক পরিসরে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোর ভেতরেও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশ কার্যত মার্সেনারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই নজিরবিহীন ক্ষতি সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বলপূর্বক গুম মানুষের জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় এবং মানুষ হিসেবে মর্যাদার অধিকার একযোগে ধ্বংস করে দেয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক আইনে এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বলপূর্বক গুমের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এই ব্যবস্থা সমাজে এমন একটি বার্তা ছড়িয়ে দেয়, রাষ্ট্র চাইলে কাউকে সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য করে দিতে পারে।
প্রসিকিউশন জানায়, গুমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, তার পরিবার ও পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়। একজন মানুষ গুম হলে তার পরিবার প্রতিদিন অনিশ্চয়তার কারাগারে বন্দী থাকে। এই অনিশ্চয়তাই, তাজুল ইসলামের ভাষায়, গুমের রাজনৈতিক কার্যকারিতা।
তিনি বলেন, যখন কাউকে হত্যা করা হয়, তখন একটি লাশ থাকে। কিন্তু যখন কাউকে গুম করা হয়, তখন থাকে শুধু প্রশ্ন। পরিবারগুলো বছরের পর বছর জানতে চায়, সে কি বেঁচে আছে, কোথায় আছে, আদৌ ফিরবে কি না।
তাজুল ইসলামের দাবি, গুম ছিল একটি দ্বৈত কৌশল। একদিকে এটি বিরোধী মতকে শারীরিকভাবে অদৃশ্য করেছে, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছে। গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি, আদালতে হাজির করা হয়নি, এমনকি মামলা দায়েরের সুযোগও দেওয়া হয়নি। আইন তখন কাগজে থাকে, বাস্তব জীবনে থাকে না।


