জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতের সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বৃহস্পতিবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপি তার প্রারম্ভিক মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারছে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে আমি এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে একটা আলাদা অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম জামায়াত ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য না এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’
গত ১১ মাসে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনা ও বিতর্ক করেছেন বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, দলের গৃহীত নীতিকে স্বীকৃত ফোরামে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া দলকে ভুল পথ থেকে ফেরানোর অন্য কোনো গণতান্ত্রিক পন্থা ছিল না।
এনসিপির সঙ্গে মতপার্থক্যের চারটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেন সামান্তা শারমিন। এগুলো হলো জামায়াতের সঙ্গে জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচন, গণঅভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা ও অধিকার এবং কাউন্সিল না করে দলের পুনর্গঠন।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক সংস্কার। কিন্তু জামায়াত এসব সংস্কারকে নিজ দলের রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রকল্পের অংশ মনে করে না।
তার অভিযোগ, জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থী এবং ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি।
২০২৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করে একটি রাজনৈতিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল এনসিপির। কিন্তু বড় দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দলটির নিজস্ব রাজনীতি ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক জয় অপেক্ষা নির্বাচনী জয়কে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে সংস্কারবিহীন সিস্টেম দিয়ে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি করার গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছে এনসিপি।’
গণঅভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা ও অধিকার প্রসঙ্গে সামান্তা বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বিজয়ের পর তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও দলটি সেই পথে হাঁটেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাউন্সিল না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জবাবদিহিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
পদত্যাগের বিবৃতিতে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে সামান্তা বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতি। নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হতে হবে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থ।
তরুণদের নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না।’
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগে আগ্রহীদের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।


