শিক্ষা ও গবেষণায় দারুণ সম্ভাবনা জাগালেও তীব্র অবকাঠামো সংকটে ব্যাহত হচ্ছে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) স্বাভাবিক কার্যক্রম। শ্রেণিকক্ষ, আবাসন, প্রশাসনিক ভবন ও প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি নিয়েই দেড় সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ কাটাতে ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের ৪৪তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাবিপ্রবি ৯ বছর অতিক্রম করলেও এখনও এটি পুরোনো একটি ফিশারিজ কলেজের অবকাঠামোর ওপর ভর করে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ সংকট রূপ নিয়েছে সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যায়। ৫ থেকে ৬টি ব্যাচের বিপরীতে অনেক বিভাগে কক্ষ রয়েছে মাত্র ২ থেকে ৩টি। ফলে বাধ্য হয়ে তাত্ত্বিক ক্লাস নিতে হচ্ছে ব্যবহারিক পরীক্ষাগারে। গ্রীষ্মকালে টিনের চালের ঘরগুলোতে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায় এবং স্বাভাবিক পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি আবাসন সংকটও তীব্র। মাত্র ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুবিধা পাচ্ছেন। সীমানা প্রাচীর না থাকায় ক্যাম্পাস জুড়ে বিরাজ করছে নিরাপত্তা উদ্বেগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী তাসমিয়া বিনতে জাহাঙ্গীর জানান, অন্যান্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামোয় এগিয়ে গেলেও জাবিপ্রবিতে এখনও টিনের ঘরে ক্লাস করতে হচ্ছে। ৭টি ব্যাচের জন্য মাত্র ৩টি কক্ষ থাকায় এক ব্যাচের ক্লাস চলাকালে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে তাদের বিভাগ থেকে প্রজেক্টর চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
তবে সীমাহীন সীমাবদ্ধতার মাঝেও গবেষণায় আশার আলো দেখাচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষক ড. মো. রাশিদুল ইসলাম বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে। তাছাড়া মাৎস্যবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ইইই এবং ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাবিপ্রবি জামালপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, বিশেষত নারী শিক্ষার প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বহুল প্রতীক্ষিত ডিপিপি প্রক্রিয়া বর্তমানে দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের পর ফাইলটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে, যা পরবর্তীতে প্রি-একনেক ও একনেক সভায় উঠবে।
সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে জাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার মো. সারওয়ার জাহান বলেন, পূর্বে উপস্থাপিত ডিপিপিতে ইউজিসির কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন ছিল। সম্প্রতি উপাচার্যসহ তারা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন এবং সেই পর্যবেক্ষণগুলো সংশোধন করে ফাইলটি পুনরায় ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর তুলনায় সুযোগ অতিসীমিত হলেও শিক্ষার স্বার্থে কষ্টের মাঝেই কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অবকাঠামোগত ঘাটতির সাথে দাপ্তরিক জনবল সংকটের কথা স্বীকার করেন জাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন। তিনি জানান, জাতীয় সংসদে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ইতিবাচক ভূমিকায় তৈরি হয়েছে ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ডিপিপি।
গত ৬ জুনের পর্যবেক্ষণের আলোকে সংশোধিত ডিপিপি ইতিমধ্যে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দেশে ফিরলেই এটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হবে। একনেক-এর অনুমোদন মিললেই শুরু হবে জমি অধিগ্রহণসহ প্রধান অবকাঠামো নির্মাণের কাজ।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়াই মূল লক্ষ্য বলে জানান উপাচার্য।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তিনি জাবিপ্রবির অবকাঠামো ও ডিপিপি অনুমোদনের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ে ডিপিপি অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে জাবিপ্রবির অবকাঠামোগত স্থবিরতার অবসান ঘটবে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।


