পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশের ৬৪ জেলায় টানা ২৬ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া পরিবেশ সংগঠক মাহবুবুল ইসলাম পলাশের দীর্ঘ আন্দোলনের শেষ হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত শহরে। বিরল ও মহাবিপন্ন বৈলাম প্রজাতির বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে এই ব্যতিক্রমী পরিবেশ আন্দোলনের ইতি টানা হয়।
শুক্রবার বিকাল ৪টায় টেকনাফ সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় পরিচালিত এ উদ্যোগ শেষ হলো।
এর আগে, গত বছরের ৫ জুন রাজশাহী শহর থেকে যাত্রা শুরু করে দেশের উত্তর প্রান্ত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে দক্ষিণের সর্বশেষ সীমান্ত টেকনাফ পর্যন্ত ভৌগোলিকভাবে পুরো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।
মাহবুবুল ইসলাম পলাশ সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ থানার বাজার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আবুল আজাদ শেখের ছেলে এবং বর্তমানে ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জভিত্তিক ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’ বর্তমানে দেশের পরিবেশ আন্দোলনে একটি ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এ পাঠশালায় বিপন্ন ও বিরল ৩৪৫ প্রজাতির পাঁচ হাজারেরও বেশি বৃক্ষ সংরক্ষিত রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের ২০ প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই পাঠশালায়।
পাখিদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে পাঠশালায় গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ফলজ বৃক্ষের বাগান এবং একটি বিশেষ পুকুর, যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুকুরের মাছ দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মাহবুবুল ইসলাম পলাশ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাট-বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে তিনি নিজ উদ্যোগে বিনামূল্যে পাটের ব্যাগ বিতরণ করে আসছেন।
গত ২৬ বছরে তিনি সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০০টিরও বেশি পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণ ও বিতরণ করেছেন। পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজে বিরল প্রজাতির বৃক্ষের বাগান স্থাপন করেছেন।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অন্তত ৩ লাখ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’র উদ্যোগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশ দিবস উপলক্ষে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ, লিফলেট বিতরণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে নিজ বাগানে তিনি একটি পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো–এই বৃহৎ পরিসরের সব কার্যক্রমের ব্যয় তিনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ও নিজ অর্থায়নে বহন করে আসছেন, যা পরিবেশ আন্দোলনে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
অনুষ্ঠানে মাহবুবুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আজ প্রকৃতিকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া সম্ভব হবে না।’
পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলের মতে, তার দীর্ঘমেয়াদি, স্বেচ্ছাসেবামূলক ও আত্মত্যাগী এই উদ্যোগ পরিবেশ শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মাহবুবুল ইসলাম পলাশ কৃষি ও বৃক্ষরোপণ খাতে দুইবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পুরস্কারসহ তিনি শতাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।


