বাংলাদেশের কড়া প্রতিবাদের মুখেও অব্যাহত রয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর ‘পুশ ইন’। চলতি মে মাসেই ‘পুশ ইনের’ সংখ্যা সহস্র ছাড়িয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ-ভারত টানাপোড়েনের মধ্যে দু’দেশের সম্পর্কে আরো খানিকটা চিড় ধরিয়েছে এই ‘পুশ ইন’ কার্যক্রম।

সবশেষ বিএসএফের ‘পুশ ইনের’ শিকার হয়েছেন ওপারের আসাম রাজ্যের একজন স্কুল শিক্ষক। এপারে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ওই ভারতীয় শিক্ষকসহ মোট ১৪ জনকে ‘পুশ ব্যাক’ করার ঘটনায় দেশটির গুয়াহাটি হাইকোর্টে বুধবার মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার ভোররাতে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের ‘পুশ ইন’ করে বলে অভিযোগ।
বিবিসির বাংলার খবরে বলা হয়েছে ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমায় এপারে কিভাবে নির্বিচারে ওপার থেকে নারী-পুরুষ-শিশুদের এপারে ‘পুশ ইন’ করা হচ্ছে! খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মে মাসেই দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে এপারে ‘পুশ ইনের’ শিকার হয়েছেন সহস্রাধিক। এ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বাদানুবাদের ভেতর বিএসএফের ‘পুশ ইন’ অব্যাহত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেছেন, ‘পুশ ইন” বা “পুশ ব্যাক” কোনো আইনসম্মত পদ্ধতি নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের মতো কাউকে “পুশ ইন” করি না, কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী।’
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘ভারত কর্তৃক বাংলাদেশি পরিচয়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ ইন সমস্যা প্রতিরোধে বাংলাদেশ কূটনৈতিক

সমাধানে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ সবসময় আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকল অনুসরণ করে আসছে।’
তিনি জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে এ সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান এ সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
দৃশ্যতঃ বাংলাদেশের এসব প্রতিবাদকে মোটেই তোয়াক্কা করছে না ভারত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এক কাপড়ে সহায়-সম্বলহীন ‘পুশ ইনের’ শিকার নারী, পুরুষ ও শিশুরা ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে তারা সকলেই নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দিয়েছেন।
বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ৭ মে থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মোট এক হাজার ৫৩ জনকে এপারে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে।
এরমধ্যে খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ১১১, কুড়িগ্রাম দিয়ে ৮৪, সিলেট দিয়ে ১০৩, মৌলভীবাজার দিয়ে ৩৩১, হবিগঞ্জ দিয়ে ১৯, সুনামগঞ্জ দিয়ে ১৬, দিনাজপুর দিয়ে দুই, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে ১৭, ঠাকুরগাঁও দিয়ে ১৯, পঞ্চগড় দিয়ে ৩২, লালমনিরহাট দিয়ে ৭৫, চুয়াডাঙ্গা দিয়ে ১৯, ঝিনাইদহ দিয়ে ৪২, কুমিল্লা দিয়ে ১৩, ফেনী দিয়ে ৩৯, সাতক্ষীরা দিয়ে ২৩ ও মেহেরপুর দিয়ে ৩০ জনকে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের দূরবর্তী মণ্ডারবাড়িয়া এলাকা দিয়েও ৭৮ জনকে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে।
শুক্রবার ভোরের দিকে খাগড়াছড়ির সীমান্ত দিয়ে নতুন করে ১৪ জনকে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে। জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের আচালং সীমান্ত দিয়ে তাদের বিএসএফ ‘পুশ ইন’ করে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলছেন, তাদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে।
বিজিবির মুখপাত্র শরিফুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, পতাকা বৈঠক ও কূটনৈতিক চ্যানেলে বারবার প্রতিবাদ জানানোর পরও বিএসএফ এ ধরনের ‘পুশ ইন’ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
তিনি বলেন, ‘বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে এবং স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করেছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আচরণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।’
বিজিবি জানিয়েছে, ২৫ মে এক রাতেই সিলেট ও মৌলভীবাজারের সীমান্ত দিয়ে মোট ১৫৩ জন বাংলাদেশিকে ‘পুশ ইন’ করেছে বিএসএফ। সীমান্ত অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গেই বিজিবি সংশ্লিষ্টদের আটক করে।
১৫৩ জনের মধ্যে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর সীমান্ত দিয়ে ৭৯ জন, পাল্লাথল সীমান্ত দিয়ে ৪২ জন এবং সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নয়াগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৩২ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে।


