টাইমস ক্লাসিক: প্রাণ ছোঁয়া ‘আগুনের পরশমণি’

টাইমস ক্লাসিক: প্রাণ ছোঁয়া ‘আগুনের পরশমণি’
ইলাস্ট্রেশন: শিপ্রা বিশ্বাস
Advertisement
Advertisement

চলচ্চিত্রকার হিসেবে মাত্র ৮টি সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার মধ্যে সবচেয়ে সেরা নির্মাণ বলা হয় ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমাটিকে। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবসে।

মুক্তিযুদ্ধের অনন্য সাধারণ গল্প খুব সহজ-সরল ভঙ্গিতে বলেছিলেন হুমায়ূন। ‘সিনেমা বানানোর গল্প’ বইতে হুমায়ূন লিখেছেন, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছবিটি নির্মাণের জন্য ২৫ লাখ টাকা সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয় লেখকের নিজের লেখা উপন্যাস ‘আগুনের পরশমণি’ অবলম্বনে। যদিও এ সিনেমার বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল তার লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’-এর শেষ দুই পর্বে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কথাই প্রধান হয়ে উঠেছিল।

হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন মূলত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ দেখে হতাশার কারণে। সিনেমাটি পরিচালনা করেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। তা দেখে হুমায়ূন আহমেদ মন্তব্য করেছিলেন, লোকে বড় পর্দায় নাটক দেখল, সিনেমা কোথায়? এরপর নিজেই সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে কিছু কঠিন সময়ও পার করতে হয়েছিল তাকে। তার স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদ চাননি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা হোন। তাই মহরতের অনুষ্ঠানেও যাননি গুলতেকিন আহমেদ। তারপরও স্বাধীনচেতা মানুষটিকে কেউ আটকাতে পারেনি। বাবার এমন সিদ্ধান্তে সঙ্গ দেন কিশোরী কন্যা শীলা আহমেদ। ছবিটিতে রাত্রির ছোট বোন অপলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শিলা।

আরও পড়ুন

চলচ্চিত্রের কাহিনি ১৯৭১ সালের মে মাসের অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীকে ঘিরে। গভীর ভয় ও হতাশার মাঝে মতিন সাহেবের (আবুল হায়াত) পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় গল্প, যেখানে তিনি ট্রানজিস্টারে (রেডিও) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করছেন। এই পরিবারে একদিন আশ্রয় নিতে আসেন তার বন্ধুর ছেলে বদিউল আলম (আসাদুজ্জামান নূর), যিনি ছিলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান সদস্য। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মতিন সাহেবের স্ত্রী (ডলি জহুর) প্রথমে বদিকে মেনে নিতে পারেননি।

ছবির প্রধান চরিত্র রাত্রি (বিপাশা হায়াত), যুদ্ধের কারণে ঘরবন্দি হয়ে দমবন্ধ অনুভব করে, আর ছটফট করে স্বাধীনতার জন্য। রাত্রি মনস্থির করে রাখে যে দেশ স্বাধীন হলে সে পোষা পাখি দুটোকে মুক্ত করে দেবে এবং ঘরে বন্ধ থাকা ঘড়িটি চালু করবে। ধীরে ধীরে বদির জন্য রাত্রির মনে ভালোবাসার জন্ম হয়।

অন্যদিকে, বদি ও তার সহযোদ্ধারা একের পর এক অভিযানে সফল হলেও পাকবাহিনীর হাতে নিহত বা বন্দী হতে থাকেন। সিনেমায় গেরিলা যোদ্ধা রাশেদুল করিমের ধরা পড়ার দৃশ্যটি ছিল যেন সাহসিকতার প্রতীক; যেখানে দেখানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য দিতে অস্বীকার করলে আঙুল কেটে ফেলার পরও তিনি মাথা নত করেননি, এমনকি পাকিস্তানি মেজরের মুখে থুথু দেন। অবশেষে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ধরনের প্রতিরোধের দৃশ্য ‘বহুব্রীহি’ নাটকেও ছিল।

আবেগ, মুক্তিযুদ্ধ, জোছনা, বৃষ্টি ও ভালোবাসার এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে এই সিনেমাটিতে। যেখানে বিপাশা হায়াতের অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। কিশোরী শীলা আহমেদের ডিম নিয়ে আঁকার কাহিনি এবং সিলেটের সাধক হাছন রাজার গানের ব্যবহারও মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের।

ছবির শেষ দৃশ্য অত্যন্ত করুণ। পাকিস্তানিদের গুলিতে বদি যখন মরণশয্যায়, তখন রাত্রি সারা রাত দুয়ারে বসে ভোরের অপেক্ষা করে। অবশেষে ভোর হলে, রাত্রি জানালা খুলে দেয় যাতে বদি শেষবারের মতো ভোরের আলো দেখতে এবং ছুঁয়ে দেখতে পারে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও রাত্রি বদিকে বলে, ‘আপনাকে চোখ বন্ধ করতে হবে না, আপনাকে ভোর দেখতে হবে’। ‘একদিন দেশ স্বাধীন হবে, আমি হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে রাস্তায় নাচব। আপনি আমার সাথে থাকবেন না?’ রাত্রির এমন কথা আবেগাপ্লুত করে দর্শকদের।

বদি সেই ভোর দেখতে পারে না, কিন্তু স্বাধীন দেশের সূর্যের ‘পরশমণি’ এসে লাগে তার কপালে, আর রাত্রি মৃত বদির হাত বাড়িয়ে দেয় দিনের নরম আলোর দিকে। এরপর বেজে ওঠে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি। এমন দৃশ্যের পরে ছবির কোনো খুঁত নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা থাকে না। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ মোট আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিল।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর