চলতি অর্থবছরে ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকার। কিন্তু প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।
এই ঘাটতি মেটাতে কর আদায়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে একদিকে যেমন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। অন্যদিকে, জোরজবরদস্তির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, জুলাই ও আগস্ট মাসে ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর মাসের পরিস্থিতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
এদিকে, সরকারের খরচ দিন দিন বাড়ছে। জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।
রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে এখন ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে সরকার প্রায় ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার বদলে আগের ঋণ পরিশোধ করেছিল।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরকে বিশেষ কৌশল নিতে বলা হয়েছে। এখন থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট বড় শিল্প খাতকে টার্গেট করে অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগ যৌথভাবে কাজ করবে এবং কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনা হবে।
সেপ্টেম্বর মাসে অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওষুধ শিল্প। অক্টোবর মাসের জন্যও আরেকটি বড় খাত বেছে নেওয়া হয়েছে, তবে কৌশলগত কারণে কর্মকর্তারা সেই খাতের নাম প্রকাশ করেননি।
কাজের চাপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঢাকার এক উপ-করকমিশনার টাইমসকে বলেন, ‘কাজের চাপে আমাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই।’
২০২৬–২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে গত বছরের চেয়ে আরও ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে, যা প্রায় ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের অর্থ জোগাতেই এই বড় লক্ষ্যমাত্রা। এই বাজেটে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি খাতের বেতন ধাপে ধাপে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ক্ষমতায় আসার আগে মেগাপ্রকল্প গ্রহণ না করার কথা বললেও, দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ইতিমধ্যে কয়েক লাখ কোটি টাকার নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই রাজস্ব আদায়ের বিশেষ কর্মসূচি এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন তদারক করছেন।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা নিয়ম মেনে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর ব্যবহার করছেন কি না, ভ্যাট কর্মকর্তারা তা যাচাই করবেন। বন্দর, কাস্টমস হাউস ও শুল্ক স্টেশনগুলোকে আদায় সর্বোচ্চ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বড় বড় কাস্টমস স্টেশনগুলোতে তদারকি আরও বাড়ানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে বলা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এনবিআরের অনলাইন টাস্কফোর্স সভায় থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সম্প্রতি উপদেষ্টা তিতুমীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়—উন্নয়ন প্রকল্প ও নতুন বেতন কাঠামোর খরচ জোগাতে রাজস্ব আদায়ের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি দেখাতে হবে।
এদিকে, ভ্যাট আদায় হঠাৎ কমে যাওয়ায় চলতি বাজেটে আনা ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমার পদ্ধতি বাতিল করে আগের মতো আবার প্রতি মাসে রিটার্ন দেওয়ার নিয়ম ফেরত আনা হয়েছে।
তবে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করে শুধু আদায়ের লক্ষ্য বাড়ালে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে জোরজবরদস্তি করার প্রবণতা বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ টাইমসকে বলেন, ‘কোনো সংস্কার ছাড়াই এনবিআরকে বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা তোলার একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা ব্যবসায়ী মহলে বড় আতঙ্ক তৈরি করেছে।’
এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ফজলুল হক টাইমসকে বলেন, ব্যবসায়ীরা এমনিতেই মন্দার মধ্যে টিকে থাকার লড়াই করছেন। অথচ সরকারের খরচ থামছে না।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। খোদ অর্থমন্ত্রীই বলেছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই থেকে তিন বছর লাগবে। অথচ সরকারের খরচ বেড়েই চলেছে।’
তিনি নতুন করে করদাতাদের হয়রানি না করে কর ফাঁকি দেওয়া ও কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা ব্যবসাগুলোকে খুঁজে বের করার তাগিদ দেন।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল টাইমসকে বলেন, ‘যার আয় বেশি, তার করও বেশি হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে কর আদায়ের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে, যাতে কম টাকা দিয়ে কেউ পার না পেয়ে যায়।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল চাপ দিয়ে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য চাই অর্থনীতি সচল করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ও উন্নয়ন কাজ বাড়লেই কেবল রাজস্ব বাড়ে। পাশাপাশি এনবিআরের অটোমেশন, সংস্কার ও কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তিনি জানান, ‘শুধু চাপ সৃষ্টি করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো যায় না।’
নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সমস্যা হলো সংস্কারের অভাব।
তিনি বলেন, ‘করের অপরিকল্পিত ছাড়, কর ফাঁকি, অনানুষ্ঠানিক খাত এবং অটোমেশন না থাকায় বিশ্বে জিডিপির তুলনায় সবচেয়ে কম কর দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় আমরা রয়েছি।’
তিনি দ্রুত একটি আধুনিক কর কাঠামো তৈরি করার পরামর্শ দেন।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—বিনিয়োগ সংকট, রপ্তানি হ্রাস, জ্বালানি ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরেও ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ।
সংস্থাটি সরকারকে রাজস্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং কঠোর মুদ্রানীতি ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
মাসিক তথ্য প্রকাশ বন্ধ করেছে এনবিআর
গত অর্থবছর শেষ হওয়ার পর থেকে এনবিআর তাদের নিয়মিত মাসিক রাজস্ব আদায়ের হিসাব প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে ভেতরে ভেতরে জুলাই ও আগস্ট মাসের ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বড় ঘাটতির কথা সরকারকে জানিয়েছে তারা। সেপ্টেম্বর পার হয়ে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ চললেও ওই মাসের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরেও বড় ঘাটতি হয়েছে। অবশ্য কাস্টমস ও ভ্যাটের তুলনায় আয়করের অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, ওপর মহলের অনুমতি ছাড়া কাউকেই তথ্য না দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে আপনারা প্রতি মাসেই হিসাব পেতেন। এখন কোনো বিভাগ থেকেই আর তা পাবেন না। চেয়ারম্যান সাহেব ছাড়া কেউ এ বিষয়ে কথা বলবেন না।’
কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি মাসের শেষ দিকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সংবাদ সম্মেলন করে হিসাব প্রকাশ করতে পারেন। তবে সেপ্টেম্বর মাসের হিসাবের জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাড়ছে সরকারের ব্যাংক ঋণ
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসেই মোট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
অথচ গত বছরের একই সময়ে সরকার ঋণ নেওয়ার বদলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল।
চলতি পুরো অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এভাবে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের সংকট তৈরি হবে এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সরকার এখন যেসব ঋণ নিচ্ছে সেগুলোর সুদের হার অনেক বেশি, যা আগের মতো সুবিধাজনক শর্তে পাওয়া যাচ্ছে না।
এই উচ্চ সুদের ঋণ ভবিষ্যতে সরকারের ওপর দায় আরও বাড়াবে, যা বাজেটের সার্বিক নমনীয়তা কমিয়ে দেবে।
এই অর্থনীতিবিদের মতে আদায় কম, খরচ বেশি এবং ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ধীরগতির এই অর্থনীতিতে সরকার এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ না থামিয়ে কীভাবে সরকারি কাজ চালিয়ে নেওয়া যায় সেটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।


