উত্তরাঞ্চলের জেলা দিনাজপুরের প্রকৃতি এখন লিচু মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত। চারদিকে ছড়িয়ে পড়া এই সুবাসকে কাজে লাগিয়ে জেলায় শুরু হয়েছে মধু সংগ্রহের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মৌ-চাষিরা দিনাজপুরের লিচু বাগানগুলোতে প্রায় দুই হাজার মৌ-খামার স্থাপন করেছেন।
কৃষি বিভাগ ও খামারিরা আশা করছেন, যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে তবে এ বছর এখান থেকে শতাধিক কোটি টাকার মধু উৎপাদিত হতে পারে।
দিনাজপুর সদরের মাশিমপুর, বিরলের মাধবাটি, খানসামার সনকা এবং বীরগঞ্জের গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার বাগানগুলোতে এখন সারিবদ্ধ মৌ-বক্সের দৃশ্য চোখে পড়ে। চাষিরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মধু সংগ্রহ করছেন। খামারিদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রতি ১০টি লিচু গাছের জন্য একটি মৌ-বাক্স বসানো আদর্শ নিয়ম। কিছু ক্ষেত্রে একটি বাক্স থেকে মাত্র ২২ দিনেই ২২ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে লিচু বাগানগুলোতে মৌ-চাষিদের এই ব্যস্ততা দিনাজপুরের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। পাইকারি বাজারে লিচু ফুলের মধু প্রতি মণ সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৌ-চাষিরা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কিছুটা আশঙ্কা থাকলেও তারা ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এই খাতের সম্ভাবনা দেখে এখন অনেক শিক্ষিত যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে মৌ-খামারের দিকে ঝুঁকছেন। মাশিমপুর এলাকার সফল খামারি মোসাদ্দেক হোসেন এই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
দিনাজপুরের লিচু ফুলের মধুর রয়েছে অনন্য স্বাদ, ঘ্রাণ ও চমৎকার রং। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন এই মধু ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতিকুল ইসলাম এই মধুর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণ নিয়ে নিবিড়ভাবে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, লিচু ফুলের মধুর বিশেষ স্বাদ ও গুণাগুণ একে অন্যান্য সাধারণ মধুর চেয়ে আলাদা ও উন্নত করেছে। অধ্যাপক আতিকুল ইসলামের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও জিআই স্বীকৃতি পেলে এই মধু আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ওয়ার্ল্ড ব্র্যান্ড প্রডাক্ট’ হিসেবে জায়গা করে নেবে। পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে মধু উৎপাদনের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আকস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে মুকুল ঝরে পড়লে মধু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খামারিরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি আধুনিক কারিগরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায় এবং সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা প্রদান করা হয় তবে এই সম্ভাবনাময় শিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।


