বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী অভিযোগ করেছেন, মব তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার ধারাবাহিকতায় সিপিবির কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব হামলার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টিকে ধ্বংস করা যাবে না।
সোমবার রাতে দলের কার্যালয়ে হামলার ঘটনার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা জীবন দেব, তবু কমিউনিস্ট পার্টির ওপর কোনো আক্রমণ বরদাশত করব না।’
হামলার জন্য দায়ীদের মববাজ ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চের ঘটনার আক্রোশ থেকে পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, ‘আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে আমাদের পার্টি কার্যালয়ে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়েছিল। কারা সেই চেষ্টা করেছিল? যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাই ঘোষণা দিয়ে আমাদের পার্টি কার্যালয়ে আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হতে পারেনি।’
সিপিবিকে পতিত সরকারের দোসর বলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। তার ভাষ্য, ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলেন দলের নেতাকর্মীরা। ১ আগস্ট সিপিবির কার্যালয় থেকে দ্রোহযাত্রার সূচনা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘অথচ আজ আমাদের বলা হচ্ছে, আমরা নাকি ফ্যাসিস্টের দোসর, পতিত সরকারের দোসর! যারা এ কথা বলছে, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।’
আবদুল্লাহ আল ক্বাফী আরও বলেন, ‘আজ যারা কমিউনিস্ট পার্টিকে পতিত স্বৈরাচারের দোসর বলছে, তাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত আপনারা কোথায় ছিলেন?’
আন্দোলনে সিপিবির ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দলের নেতাকর্মীদের মিছিলের ছবি ও ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যাবে। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সিপিবির কার্যালয়কে আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ওই কার্যালয় থেকেই কারফিউ ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০১৩ সালের ৫ মে পার্টির কার্যালয়ের তিনতলা পর্যন্ত গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর দলটিকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানও দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যারা এই হামলা করেছে, তারা মববাজ ও সন্ত্রাসী। কমিউনিস্ট পার্টির বদনাম করে তারা ২০২৫ সালের ১৫ মার্চের সেই আক্রোশ মেটাতে চায়।’
তবে হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান। তার ভাষ্য, হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ভিডিও ফুটেজ দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘কার্যালয়ে হামলার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। তবে সেগুলো এখনো দেখা হয়নি। আগামীকাল ফুটেজ দেখে প্রয়োজন হলে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানানো হবে।’
বক্তব্যে তিনি মব সৃষ্টি করে মাজার ভাঙচুর, পত্রিকার কার্যালয়ে আগুন দেওয়া এবং পার্টি কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগও তোলেন। উদীচী ও ছায়ানটে আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মব তৈরি করে সিপিবির কার্যালয়ের কোনো ক্ষতি করা যাবে না।
জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আবদুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যারা সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২৫ হাজার মানুষকে পঙ্গু করেছে, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তাদের বিচার হতে হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
এদিকে, সিপিবির দুই নেতাকে আটক করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তারা হলেন ঢাকা উত্তর যুব ইউনিয়নের সভাপতি ইরান মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল ফকির। তারা সিপিবির সদস্য বলেও জানান তিনি। তাদের মুক্তির বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল ক্বাফী আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ রাতের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দেবে।
কার্যালয়ে হামলার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে একটি মিছিলের স্লোগানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা দীপক শীলকে গ্রেপ্তারের পর মুক্তি দেওয়া হলে তাকে কেন্দ্র করে একটি মিছিল হয়েছিল। ওই মিছিলে ‘জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে তাকে জানানো হয়েছে। হামলাকারীরা স্লোগানটির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল কি না, তা তিনি নিজে জানেন না উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, ‘তবে আমাকে বলা হয়েছে, জয় সমাজতন্ত্র ও জয় সর্বহারা স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং, জয় সমাজতন্ত্র বা জয় সর্বহারা স্লোগান দেওয়া কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না। এমনকি জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হলেও সেটি অপরাধ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘জয় বাংলা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তাদের কাছে এই স্লোগান আপত্তিকর হতে পারে। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, তাদের জন্য এটি গর্বের স্লোগান।’
সিপিবির পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানিয়ে আবদুল্লাহ আল ক্বাফী বলেন, মঙ্গলবারের মধ্যে সব তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে বুধবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।


