ছিটমহল আর অপদখলীয় জমির বহু বছরের পুরোনো বিরোধ মিটে গেলেও ফেনীর মুহুরী চরের মাত্র দুই কিলোমিটার বিরোধপূর্ণ এলাকায় আটকে আছে বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাড়ে ছয় কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্তের একটি অংশ হলো এই বিরোধপূর্ণ এলাকা। বাংলাদেশের পরিষ্কার কথা–১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি আর ২০১১ সালের প্রটোকল মেনেই যৌথভাবে মুহুরী চরের সীমানা ঠিক করা হয়েছিল। এমনকি ২০১২ সালে দুই দেশই মানচিত্রে (ইনডেক্স ম্যাপ) সই করেছিল।
তবে পরে বেঁকে বসে ভারত। তাদের দাবি, ওই মানচিত্রে ভুল করে সই করা হয়েছিল। তাই তারা নতুন করে আবার সই করার প্রস্তাব দেয়।
বাংলাদেশ এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ঢাকার সাফ কথা–সীমান্ত একবার যখন ঠিক হয়ে গেছে, তখন নতুন করে এই আলোচনা শুরুর কোনো সুযোগ নেই।
এই এক মতভেদের কারণে আটকে গেছে পুরো সীমান্ত চুক্তির কাজ। অথচ ১৯৭৪ সালে দুই দেশের তিনটি বড় সমস্যা মেটাতে এই ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল–ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমি সমস্যার নিষ্পত্তি আর বাকি অচিহ্নিত সীমান্ত চিহ্নিত করা।
কয়েক দশক ধরে আলোচনার পর ২০১১ সালে চুক্তিটি চালুর নিয়মাবলী (প্রটোকল) সই হয়। এরপর ২০১৫ সালে ভারতের পার্লামেন্টে এটি পাস হলে দুই দেশ ছিটমহল অদলবদল করে, বেশিরভাগ অপদখলীয় জমি সমস্যার সমাধান ফেলে। কিন্তু সীমানার যেটুকু অংশ অচিহ্নিত ছিল, তা আর মিটল না।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা ১ হাজার ১৪৫টি স্ট্রিপ ম্যাপে ভাগ করা। সীমান্ত কর্মকর্তারা জানান, ১ হাজার ১৪৪টি মানচিত্রে দুই দেশই সই করে ফেলেছে। শুধু শেষ মানচিত্রটিতে সই করতে রাজি হচ্ছে না ভারত।
এখনো তিনটি জায়গায় সীমান্ত অমীমাংসিত–ফেনীর মুহুরী চরে প্রায় দুই কিলোমিটার, সিলেটের লাঠিটিলায় তিন কিলোমিটার এবং পঞ্চগড়ের দইখাতায় দেড় কিলোমিটার।
যৌথ সমীক্ষার পর ভারত লাঠিটিলা ও দইখাতার সীমানা মেনে নিলেও মুহুরী চরের বেলায় এসে আর রাজি হয়নি।
বিরোধ যেভাবে পুনরায় সামনে এল
ভৌগোলিক মাপজোখ আর এলাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশ মুহুরী চরে নিবিড় জরিপ চালায়। সব প্রক্রিয়া শেষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে তারা মানচিত্রে সই করে।
এরপর দুই দেশের যৌথ তদারকিতে ২০১৪ সালে ওই এলাকায় ৪৪টি সীমান্ত পিলারও বসানো হয়।
কিন্তু বাঁধ সাধে ভারত। ২০১৫ সালে উভয় দেশের ভূমি জরিপ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে তারা আবার বিষয়টি তোলে।
পরবর্তীতে ভারত সরকার ‘জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর বৈঠকে দাবি করে, ওই মানচিত্রে ভুলবশত সই পড়ে গিয়েছিল। তাই তারা সেটি আবার নতুন করে সই করার প্রস্তাব দেয়।
বাংলাদেশ এই প্রস্তাব একবাক্যে খারিজ করে দিয়ে জানায়, ১৯৭৪ সালের চুক্তি আর ২০১১ সালের প্রটোকল মেনেই সব কাজ শেষ হয়েছে।
ঢাকার যুক্তি হলো–নিয়ম মেনে যে সমঝোতা হয়ে গেছে, তা বদলে ফেলার কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত সুযোগ নেই।
দুই দেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বিষয়টির কোনো সুরাহা না হওয়ায় এটি এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
বিতর্কিত জমি
সরকারি ও খবরের কাগজের হিসেব অনুযায়ী, মুহুরী চরের এই এলাকার মোট আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একর। ২০১১ সালের প্রটোকলের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ পাবে ৭১ দশমিক ৯৪ একর জমি, আর ভারতের ভাগে পড়বে ২০ দশমিক ২০ একর।
সীমান্ত সমস্যা সমাধানের অংশ হিসেবেই ২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি দুই দেশের জরিপ দল যৌথভাবে চরে নতুন করে সমীক্ষা চালায়।
তবে জমির বর্তমান দখল নিয়ে স্থানীয়দের বক্তব্য আবার অন্যরকম।
স্থানীয় এক সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশিদের দখলে আছে মাত্র ৩১ দশমিক ১৮ একর জমি, আর ভারতীয়দের দখলে প্রায় ৮ একর। বাকি ৫২ দশমিক ৯৬ একর কার দখলে থাকবে–তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মালিকানা আর দখলের এই গরমিল বিরোধের হিসাবকে আরও পেঁচিয়ে দিয়েছে।
অনিশ্চয়তায় সাধারণ জমির মালিকরা
সমস্যাটা আটকে থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন স্থানীয় সাধারণ চাষিরা। তাদের কাছে বাপ-দাদার আমল থেকে মুহুরী চরের জমির সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। কিন্তু সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে তারা নিজেদের জমিতে পা দিতে পারছেন না, করতে পারছেন না কোনো চাষাবাদ।
সহজ কথায়, কাগজে-কলমে তারা জমির মালিক হলেও বাস্তবে জমির ধারেকাছেও ভিড়তে পারছেন না।
উত্তর কাউতলী গ্রামের ফকির নূর মোস্তফার পরিবারের মুহুরী চরে প্রায় ১০ একর জমি আছে। তিনি জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধা আর হুমকির কারণে গত কয়েক দশক ধরে তারা নিজেদের জমির বড় অংশে ঢুকতেই পারছেন না।
দুঃখ প্রকাশ করে নূর মোস্তফা বলেন, ‘আমার ভাইদের বেশিরভাগ জমিই চরে পড়ে আছে। কিন্তু ৩০-৪০ বছর ধরে আমরা সেখানে কোনো ফসল ফলাতে পারছি না।’
একই এলাকার বাসিন্দা দাউদুল ইসলাম ফকির বলেন, তাদের কাছে সিএস এবং বিএস খতিয়ানের সব পাকা দলিল আছে। তবুও তারা নিজের জমিতে যেতে পারেন না।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে আমরা আমাদের ভিটেমাটির দখল নিতে পারছি না।’
১৯৮৯ সালের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা স্মরণ করে দাউদ ফকির বলেন, ওই বছর নুরুল আলম নামে এক বাংলাদেশি কৃষক নিজের জমি থেকে ঘাস কাটতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান।
স্থানীয়রা জানান, ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আতঙ্কে চাষিরা আর ওই এলাকায় ঘেঁষতে চান না। ফলে জমিগুলো পড়ে থেকে চাষাবাদ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
মানবিক প্রভাবযুক্ত এক সীমান্ত সমস্যা
মুহুরী চরের এই ঝুলন্ত অবস্থা কেবল মানচিত্র বা সীমান্ত রেখার কোনো প্রযুক্তিগত বিরোধ নয়, এর সাথে মানুষের জীবন-জীবিকাও জড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান খুব সোজা–দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেই সীমান্ত ফয়সালা হয়ে গেছে। কিন্তু স্থানীয় সাধারণ মানুষের কাছে এর মানে হলো, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও নিজেদের জমি ব্যবহার করতে না পারা।
মোট ১ হাজার ১৪৫টি মানচিত্রের মধ্যে ১ হাজার ১৪৪টিতেই সই হয়ে গেছে। এখন কেবল মুহুরী চর নিয়ে এই অমীমাংসিত বিরোধই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের পথে শেষ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


