চট্টগ্রাম মহানগরীর অপরাধ জগতের অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হাসান রাজু নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। খুন, চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার বাহিনীতে যোগ দিতে পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিতে হয় এবং সেই শপথ ভঙ্গের পরিণতি মৃত্যু।
এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন রাউজানের হাসান রাজু। একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও ৫ আগস্টের পর তিনি বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে যোগ দেন বলে জানা গেছে।
গত ২৬ এপ্রিল রাউজানের নাসির উদ্দীন হত্যা মামলায় তিনি ৭ নম্বর আসামি ছিলেন। তবে সম্প্রতি সাজ্জাদের সঙ্গে রাজুর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সেই দ্বন্দ্বের জেরেই গত বৃহস্পতিবার রাতে নগরের রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মদিনা কলোনিতে বোনের বাসার সামনে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এ ঘটনায় মোছাম্মৎ রেশমি আক্তার (১১) নামে এক পথচারী শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। রাজুর বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর এলাকায়। আহত রেশমি শহীদ মিনার গলির রিয়াজ আহমদের মেয়ে। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাত ১০টার পর একদল মুখোশধারী সন্ত্রাসী শহীদ মিনার কলোনির প্রবেশমুখে রাজুকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাজুকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে চারজন মুখোশধারী এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে দুইজন রাজুর দুই পা চেপে ধরে এবং বাকি দুইজন তার মাথায় দুটি ও বুকে তিনটি গুলি করে চলে যায়। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাউজানের রায়হান, সাজ্জাদের ভাইপো মোহাম্মদ, ২ নম্বর গেট এলাকার বোরহান, ফটিকছড়ির ‘গলাকাটা’ মোবারক এবং রাউজানের দামা ইলিয়াস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, তারা বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
যদিও পুলিশের ধারণা, হত্যার পেছনে পুরোনো শত্রুতাও থাকতে পারে। গত ২৬ এপ্রিল রাউজানের কদলপুরে প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিন নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন নাসিরের মেয়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজু ৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে যোগ দেন। সম্প্রতি সাজ্জাদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস
হত্যাকাণ্ডের পর একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গত বছরের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে সংঘটিত জোড়া খুনের অন্যতম আসামি এবং সাজ্জাদের অনুসারী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন গত ৭ মে রাতে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।
সেখানে তিনি সিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজকে দায়ী করে দাবি করেন, নগরের সন্ত্রাসীদের দিয়ে চাঁদাবাজি করানো হতো এবং সেই অর্থের একটি অংশ কমিশনার নিতেন। স্ট্যাটাসে ভবিষ্যতে যেকোনো খুনের দায়ও হাসিব আজিজকে নিতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে রাজু হত্যার পরপরই ‘ডেভিট ইমন’ নামের আইডি থেকে স্ট্যাটাসটি মুছে ফেলা হয়।
সিএমপির উত্তরের উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানান, স্ট্যাটাসটি তাদের নজরে আসেনি। তবে রাজুর বিরুদ্ধে রাউজান থানায় মামলা রয়েছে এবং রায়হান গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
কে এই বড় সাজ্জাদ?
নগরের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকার আবদুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদ আলী। ১৯৯৯ সালের ২ জুন পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান বাড়ির সামনে খুন হন।
লিয়াকত হত্যায় সাজ্জাদ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ থাকলেও কেউ আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ায় ওই হত্যা মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়ে যান। লিয়াকত হত্যার পর অপরাধজগতে সাজ্জাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
২০০০ সালের ১২ জুলাই। মাইক্রোবাসে করে একটি দলীয় সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মী। পথে বহদ্দারহাটে ওই মাইক্রোবাস থামিয়ে ব্রাশফায়ার করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনাস্থলেই ওই ছয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ আটজন মারা যান। ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদ নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
২০০০ সালের ১ অক্টোবর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বড় সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে জামিনে বেরিয়ে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বিদেশে পলাতক থাকলেও সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ এবং রাউজান এলাকায় তার বাহিনীর তৎপরতায় জনমনে আতঙ্ক রয়েছে। গত দেড় বছরে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে তার অনুসারীদের নাম এসেছে।
কুরআন হাতে শপথ
গত ১০ মার্চ সিএমপি জানিয়েছে, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে নতুন সদস্যদের কোরআন হাতে শপথ করিয়ে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই শপথের ভিডিও দুবাইয়ে অবস্থানরত সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়।
উদ্ধার করা একটি ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায়, জীবন-মরণ যাই হোক, সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না।
অধরা বাহিনীর মূল সদস্যরা
পুলিশের তথ্যমতে, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে ২০ থেকে ২২ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে ছোট সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকলেও রায়হান, বোরহান উদ্দিন, নেজাম উদ্দিন, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন এবং মাছ হেলাল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ রায়হান, যিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে বের হয়ে নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রায়হান বর্তমানে সাজ্জাদের অস্ত্রভাণ্ডারের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


