বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রোববার থেকে সংকটাপন্ন পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শুরু করবেন। প্রতিদিন একটি করে ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক হবে, যা শেষ হবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর। এ বৈঠকগুলোকে মার্জার প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। রোববার এক্সিম ব্যাংক, সোমবার এসআইবিএল, মঙ্গলবার ফার্স্ট সিকিউরিটি, বুধবার ইউনিয়ন ব্যাংক এবং বৃহস্পতিবার গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক হবে। তবে একীভূত হতে এখনো আগ্রহী নয় এক্সিম ব্যাংক।
বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রোববার থেকে প্রতিটি ব্যাংকের একিউআর প্রতিবেদন নিয়ে তাদের পর্ষদের সঙ্গে পৃথকভাবে বসব। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা বোর্ডগুলোকে অবহিত করা হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই প্রতিবেদন (একিউআর) নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে। প্রভিশন ঘাটতি, তারল্য সংকটসহ দুর্বলতা ও শক্তির দিকগুলো পর্ষদকে জানানো হবে। বৈঠকে গভর্নরসহ টাস্কফোর্সের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানরা থাকবেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যাচাই করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদনে পাঁচ ব্যাংকের ভয়াবহ আর্থিক চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা হলেও বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ।
ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি ঋণ—ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ, এসআইবিএলের ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
ইউনিয়ন ব্যাংকের এক পর্ষদ সদস্য বলেন, ‘মার্জারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের সঙ্গে বসতে যাচ্ছে।’
তবে শুরু থেকেই একীভূত হতে অনাগ্রহী এক্সিম ব্যাংক। যে কারণে মার্জার প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পেতে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং এসব শর্ত পূরণের একটি রোডম্যাপ চেয়েছে ব্যাংকটির বোর্ডের কাছে। এই রোডম্যাপ নিয়েই আজকের মিটিংয়ে বসছেন ব্যাংকটির পর্ষদ সদস্যরা।
এক্সিম ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো ব্যাংকের মালিক পক্ষই চাইবে না অন্য ব্যাংকের সঙ্গে মার্জারে যেতে। এক্সিম ব্যাংকের কেন মার্জারে যাওয়া উচিত নয় সেই বক্তব্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া শর্ত পূরণের জন্য একটি রোডম্যাপও দেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে হওয়া প্রথম বৈঠকেই এক্সিম চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম স্বপন জানিয়েছিলেন, তাদের একীভূত হওয়ার আগ্রহ নেই। এর প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সিআরআর, এসএলআর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া আট হাজার কোটি টাকা ঋণ শোধ করা গেলে মার্জার এড়ানো যাবে।
তবে এক্সিম ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।
অন্যদিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাফিউজ্জামান শাফিউজ্জামান বলেন, ‘রোববারের বোর্ড মিটিংয়ে আলোচনা হবে, এরপর সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠকে যাব।’ ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে আগেই দুটি পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে একজন পর্ষদ সদস্য বলেন, ‘পর্ষদ পর্যায়ে আপত্তি নেই, কিন্তু স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের তীব্র আপত্তি রয়েছে।’
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মার্জার প্রক্রিয়া সফল হলে ব্যাংক খাতে সংকট থেকে সম্ভাবনা তৈরি হবে। এগুলো শূন্য ছিল না। একত্রিত হলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ‘পাঁচ ব্যাংকের মার্জার করতে দেড় লাখ কোটি টাকা লাগবে। তবে প্রাথমিকভাবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগাড় করা গেলে নতুন ব্যাংক চালানো সম্ভব।’
এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে, ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানত বিমা তহবিল থেকে, আর ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ শেয়ারে রূপান্তরিত হবে বলে জানান তিনি।