সরকারের সমালোচনা মানা হবে না, আরেক প্রমাণ ভালুকায়?

সরকারের সমালোচনা মানা হবে না, আরেক প্রমাণ ভালুকায়?
Advertisement
Advertisement

বিএনপিকে ভোট দেওয়ায় আক্ষেপ এবং সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য রেখে কারাগারে যেতে হয়েছে এক নারী উদ্যোক্তাকে।

তার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দল বেধে হানা দিয়েছেন তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুলিশ সেই ব্যবসায়ীকেই ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তুলেছে। পরে জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন বিচারক।

রোববার রাত ৮টার দিকে ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকায় সাথী আক্তার নামে সেই ব্যবসায়ী বিএনপির নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়েন।

স্থানীয় থানার ওসি যদিও বলেছে, সাথীর বক্তব্যে সরকারবিরোধী কোনো কিছু পাওয়া যায়নি, তারপরেও তাকে তিনি গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন।

রোববার দুপুরে ‘সাথী মেকওভার’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন সাথী। তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঘনঘন চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জানান, সম্প্রতি তার দুটি শোরুম ও আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকানের বিদ্যুতের তার, এসির তার এবং বাসা থেকে অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগও তোলেন এই ব্যবসায়ী। বলেন, সব হারিয়ে তার পাগল হওয়ার মতো অবস্থা।
‘কাকে ভোট দিয়ে আজ এই ভুক্তভোগী হলাম!”- গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করায় এভাবেই আক্ষেপ করেন তিনি।

বিএনপি নেতাকর্মীরা রাতে উত্তেজিত অবস্থায় সাথী আক্তারের পার্লারে হানা দেয়। তারা সাথীকে জেরা করতে থাকে। পার্লারে ভাঙচুরের আশঙ্কায় একজন থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাথী আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে থানায় যায়।

ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিউটি পার্লারে হামলার আশঙ্কায় খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ওই নারীকে থানায় নিয়ে আসে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা বা সমালোচনার অধিকার থাকলেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়াতে আমরা তাকে হেফাজতে নিয়েছি। তবে ভিডিও পর্যালোচনা করে সরকারবিরোধী কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। প্রসিকিশন দিয়ে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়।’

পরে বিকালে ময়মনসিংহের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক সাজেদুল ইসলাম জামিন আবেদন নাকচ করে সাথীকে কারাগারে পাঠান।

আরও পড়ুন

সাথীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায়। এই ধারায় বলা আছে, কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে পারলে পুলিশ কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ও পরোয়ানা ছাড়াই সেই পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।

এই গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তার বিবেচনাই প্রধান বিষয়। এতে বলা আছে, যদি সেই কর্মকর্তার কাছে মনে হয় যে অন্য কোনোভাবে সেই অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তাহলে তিনি গ্রেপ্তার করবেন।

এই ধারার অধীনে কাউকে কোনো অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় না, তাই এর কোনো নির্দিষ্ট সাজা বা মেয়াদের কারাদণ্ড নেই।

আদালতে হাজির করার পর ম্যাজিস্ট্রেট সাধারণত দুটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, প্রথমত. যদি মনে হয় অপরাধের কোনো বাস্তব আশঙ্কা নেই, তবে আদালত তাকে ছেড়ে দিতে পারেন বা মুচলেকা নিয়ে জামিন দিতে পারেন।

আবার যদি আশঙ্কা সত্যি হয়, তবে আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারার অধীনে শান্তিরক্ষার জন্য বা ১০৯/১১০ ধারার অধীনে ভালো আচরণের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের (যেমন: ১ বছর) মুচলেকা বা জামানত দাবি করতে পারেন। জামানত দিতে ব্যর্থ হলে তখন তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

ভালুকার ওসি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা যদি তাকে (সাথী) না নিয়ে আসতাম, তাহলে একটা ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা আশা করেছিলাম, ব্যবসায়ীরা কেউ এলে তাকে দিয়ে দেব। পরে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হলে তারা এসেছেন।’

১৫১ ধারায় অভিযোগ কেন আনলেন, এই প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, সাথী মারমুখী আচরণ করেছেন, যে কারণে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
তবে সরকারবিরোধী বক্তব্যের কারণে এটিই এমন প্রথম ঘটনা নয়।

সম্প্রতি সিলেটে কিন্ডার গার্টেন স্কুলের এক শিক্ষক ফেসবুক পোস্টে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশির কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার পর তাকে থানায় নিয়ে ১০ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখা হয়। পরে সাদা কাগজে তার কাছ থেকে সই নিয়ে ছাড়া হয়।

গাজীপুরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করে ভিডিও পোস্ট করার পর দুই তরুণকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা তারাগারে।

এই ঘটনাগুলো বাক স্বাধীনতা নিয়ে বিএনপি নির্বাচনি অঙ্গীকারে বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সাথীকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, ‘বর্তমানে যেসব কর্মকাণ্ড ঘটছে, সেগুলো দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন পরিবর্তনের আসলে কী লাভ হলো? কারণ এসব ঘটনা এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করছে যে, ৫ আগস্টের আগে (২০২৪ সাল) মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে সেই পরিবর্তন এখনও আসেনি।’

‘আগে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে কিংবা নিজের মতামত প্রকাশ করলে মামলা-হামলার শিকার হওয়ার ভয় ছিল। এখন যদি একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে আগের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পার্থক্য কোথায়?’, বলেন তিনি।

এতে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে বলেও মনে করেন এই আইনজীবী। বলেন, ‘সরকারপ্রধান বা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি সত্যিই এমন কর্মকাণ্ড না চান, তাহলে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বিএনপি নেতা-কর্মী ও পুলিশের এই তৎপরতা স্পষ্টতই ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি অঙ্গীকারের লঙ্ঘন।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬ উল্লেখ করে লেখা হয়, ‘গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।’

ইশতেহারেও লেখা আছে, ‘এমন একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করা হবে, যেখানে কোনো মত বিশ্বাস বা পরিচয় অবমূল্যায়িত হবে না। মুক্ত ও নিরাপদ মত প্রকাশ স্বাধীন গণমাধ্যম ও বাধাহীন চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad