শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে বন্দিদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজনই কারারক্ষী। তারা সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় তাদের কাছে থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়। ভয়াবহ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক বন্দি ও কারারক্ষী।
দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে প্রাণঘাতী কারাগার দাঙ্গা।
দেশটির পুলিশের বরাতে সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে সোমবার বলা হয়, রাজধানী কলম্বোর উত্তরে নেগোম্বো কারাগারে দুটি মাদক চক্রের বন্দি সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রোববার রাতভর সংঘর্ষে অনেকের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। সংঘর্ষ থামাতে গেলে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের ওপরও উভয়পক্ষ থেকে হামলা হয়। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে হতাহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নেগোম্বো হাসপাতালের পরিচালক পুষ্প গামলাথ জানান, সরকারি এই হাসপাতালে ২৩ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। এ ছাড়া নেগোম্বো কারাগারের আহত বন্দি ও কারারক্ষী মিলিয়ে শতাধিক মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা রয়েছে। আবার অনেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের পাশাপাশি গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। গুরুতর আহত ১৮ জনকে কলম্বো জাতীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

দেশটির আইন ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক মন্ত্রী হর্ষণ নানায়াক্কারের তথ্যমতে, আহতদের মধ্যে পড়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। তিনি এ ঘটনায় গভীর শোক ও বিস্ময় জানিয়ে বলেন, ‘কারাগারের ভেতরে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে আলাদা করার জন্য কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।’
কারাগারে বন্দিদের মধ্যে দাঙ্গার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা বন্দি ছিলেন কি না বা অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নয়। মানুষ মারা গেছে এবং এ ঘটনায় গভীর শোক তৈরি হয়েছে। এমন ঘটনা কখনোই ঘটার কথা নয়।’
মন্ত্রী জানান, রোববার সন্ধ্যায় নেগোম্বো কারাগারে সংঘর্ষ শুরু হয়। কারাগারটিতে কয়েক হাজার বন্দি রয়েছে। সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাশের একটি অংশে থাকা নারী বন্দিরা কারাগারের ছাদে উঠে মুক্তির দাবি জানান। একপর্যায়ে তাদের ভারে ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং এতে বেশ কয়েকজন নারী বন্দি আহত হন।
দাঙ্গার কারণ ও ঘটনা তদন্তে সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি।
কারা বিভাগের মুখপাত্র চামিন্দা গাজানায়েকে জানিয়েছেন, দাঙ্গায় কোনো বিদেশি বন্দি হতাহত হননি। এ বক্তব্যের পেছনে কারণ হিসেবে জানানো হয়, ২২ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নারী বর্তমানে নেগোম্বো কারাগারে বন্দি রয়েছেন। গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘কুশ’ নামের অত্যন্ত শক্তিশালী ধরনের ৪৬ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তারের পর তাকে সেখানে রাখা হয়।

এদিকে সোমবার নেগোম্বো কারাগারের বাইরে বন্দিদের স্বজনদের বড় ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেশটির বিমানবাহিনী ড্রোন ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা গুলির শব্দ শুনেছেন। এ ছাড়া খবর পাওয়া গেছে, দাঙ্গার আগে বন্দিরা কারারক্ষীদের কাছ থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়েছিল।
এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরেও শ্রীলঙ্কার আরেকটি কারাগারে দাঙ্গায় ১১ বন্দি নিহত এবং ১১৭ জন আহত হয়েছিলেন। ওই সময় করোনাভাইরাস মহামারির চরম পরিস্থিতির মধ্যে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমাতে সরকার শত শত বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে ৪১ হাজার ২৫০ জন বন্দি ছিলেন। দেশটির কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি।


