বাংলাদেশের শহরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় পাকিস্তান অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ছাড়াও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তানের চল্লিশটিরও বেশি প্রধান শহরে বাস্তবায়িত “সেফ সিটির” উদ্যোগ এবং আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত অনুকরণীয় হতে পারে।’
বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুই হাজার পঁচিশ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব থাকার সময় ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচির ‘নিরাপদ শহর’ মডেল পরিদর্শন করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শহরগুলোকে আরও নিরাপদ করতে পাকিস্তান কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতা প্রদান করতে পারে।’
বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারত্ব ও দক্ষতা বাড়াতে পুলিশ কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানেও পাকিস্তানের সহযোগিতা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও পাকিস্তান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদী তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই উপায়ে ফিরিয়ে নেয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের জোরালো ও ধারাবাহিক সমর্থন প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।’
পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মানবিক সংকটের বিষয়টিকেও সালাহউদ্দিন আহমদ গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় পারিবারিক নথিপত্রের অভাবে অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশটির কম্পিউটারাইজড জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তিতে জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এর ফলে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এর দ্রুত স্থায়ী সমাধানের জন্য পাকিস্তানের মন্ত্রীকে বিশেষ অনুরোধ জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আলোচনার শুরুতে সালাহউদ্দিন চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, এই সফরের ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে মাদকদ্রব্য ও মনোদৈহিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা দুই দেশের সীমান্ত ও সমাজকে সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। দুই দেশের ‘অভিন্ন ইতিহাস’ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার কথাও বলেন বাংলাদেশের মন্ত্রী।
চৌদ্দ বছর বিরতির পর ঢাকা-করাচি রুটে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি সুবিধাজনক সময়ে সফরে যাওয়ার কথাও বলেন।

ভিয়েতনামের সঙ্গে বৈঠক
পরে ভিয়েতনামের সঙ্গেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন সালাহউদ্দিন। দেশটির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জননিরাপত্তা বিষয়ক উপমন্ত্রী জ্যেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট জেনারেল নগুয়েন ভ্যান লং।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক স্তরে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে আগ্রহী।
বৈঠকে ভিয়েতনামে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে ভিয়েতনাম সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন।
তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত পর্যটক, ব্যবসায়ী, বৈধ কর্মজীবী এবং পারিবারিক ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ ও শিথিলকরণের অনুরোধ জানান।
মানবপাচার, মাদক চোরাচালান ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মত দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ‘অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি’ সই হলে বাণিজ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে।
মন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির অনুমতি দেওয়ায় ভিয়েতনাম সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশি ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে আমদানির অনুরোধ করেন।


