আর্জেন্টিনা বনাম মিসর ম্যাচের পর তীব্র তোপের মুখে পড়েছেন বিশ্বসেরা ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচে মোস্তফা জিকোর বাতিল হওয়া গোল এবং ম্যাচের শেষ দিকে মিসরের পেনাল্টি ও ফাউলের দাবি উপেক্ষা করার পেছনে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আর উয়েফার অন্যতম শীর্ষ রেফারি হওয়া সত্ত্বেও এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে চলে এসেছেন ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা লেতেক্সিয়ে।
কে এই ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে?
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ও হাই-প্রোফাইল রেফারিং ক্যারিয়ার নিয়ে এই ম্যাচ পরিচালনা করতে এসেছিলেন লেতেক্সিয়ে। ফ্রান্সের ব্রিটানির বেদিতে জন্ম নেওয়া ৩৭ বছর বয়সী এই ফরাসি রেফারি উয়েফার সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত অফিশিয়ালদের একজন।
ফুটবল মাঠের বাইরে পেশায় একজন আইন বিশেষজ্ঞ লেতেক্সিয়ে ২০১৬ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ফ্রান্সের ‘লিগ ওয়ান’-এর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারিদের তালিকায় রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার উত্থান ছিল দ্রুত এবং মর্যাদাপূর্ণ।
তিনি ম্যানচেস্টার সিটি ও সেভিয়ার মধ্যকার ২০২৩ উয়েফা সুপার কাপ ফাইনাল পরিচালনা করেন। ২০২৪ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে চতুর্থ অফিশিয়াল ছিলেন। স্পেন ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার বিখ্যাত উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার মূল দায়িত্ব পান তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ফেডারেশন কর্তৃক তিনি ২০২৪ সালের বিশ্বের সেরা পুরুষ রেফারি হিসেবে মনোনীত হন।
ইউরোপের অন্যতম বিশ্বস্ত এই অফিশিয়ালের সুনামই এখন মিসরীয় শিবিরের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
যে সিদ্ধান্তগুলো লেতেক্সিয়েকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে
মিসরীয় শিবিরের অভিযোগ, ম্যাচের শুরু থেকে মাঠের দুই প্রান্তে শারীরিক সংস্পর্শ বা ফাউল বিচারের ক্ষেত্রে সমান মানদণ্ড বা ‘একই নিয়ম’ বজায় রাখেননি লেতেক্সিয়ে।
খেলার ১৯তম মিনিটে মিসরের হাইসেম হাসান পেনাল্টি বক্সের ভেতরে নিকোলাস তালিয়াফিকোকে ফাউল করলে লেতেক্সিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আর্জেন্টিনার পক্ষে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। লিওনেল মেসির নেওয়া সেই পেনাল্টি শটটি মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেরের দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দিলেও এই সিদ্ধান্তটি ম্যাচের শারীরিক সংস্পর্শের একটি প্রাথমিক মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর মিসরের পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে মোহাম্মদ সালাহকে আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস লতিয়ে দিলেও লেতেক্সিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মিসরের দাবি, এখানে ফাউল ও বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পাওয়া উচিত ছিল তাদের।
সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় খেলার ৬২তম মিনিটে। হাইসেম হাসান ও সালাহর যৌথ আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো চমৎকার এক গোল করে মিসরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। কিন্তু ভিএআর হস্তক্ষেপ করে লেতেক্সিয়েকে আক্রমণের আগের একটি ঘটনা অন-ফিল্ড মনিটরে দেখার অনুরোধ জানায়।
রিভিউতে দেখা যায়, গোল হওয়ার প্রায় ৩০ সেকেন্ড আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার শুরুতে মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জার্সি টেনে ধরেছিলেন এবং তার পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। লেতেক্সিয়ে গোলটি বাতিল করেন। মিসরের ক্ষোভের জায়গা হলো–গোলের এত আগে (প্রায় ৩০ সেকেন্ড পূর্বে) ঘটে যাওয়া ফাউল ধরতে ভিএআর কেন এত দূর পেছনে ফিরে গেল?
ম্যাচের শেষ দিকে এই অসঙ্গতির বিতর্ক আরও জোরালো হয়। আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সের ভেতরে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার মিসরের হামদি ফাতিকে স্পষ্ট টেনে ধরেছেন মনে হলেও লেতেক্সিয়ে বা ভিএআর কেউই পেনাল্টি দেননি। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই পাল্টা আক্রমণ থেকে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেস আর্জেন্টিনার হয়ে জয়সূচক ৩-২ গোলের ব্যবধান গড়ে দেন। মিসরের দাবি, ফার্নান্দেসের ওই চূড়ান্ত শটের ঠিক আগের মুহূর্তেও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ফাউল করেছিলেন।
জিকোর গোলের বেলায় ভুলের খোঁজে ভিএআর অনেক দূর পেছনে ফিরে গেলেও আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মিসরের পেনাল্টির দাবির ক্ষেত্রে ভিএআর বা রেফারি একই তীব্রতার সঙ্গে নিয়ম প্রয়োগ করেননি–এটাই মিসরের মূল হতাশা। ম্যাচ শেষে তীব্র প্রতিবাদ করায় গোলরক্ষক শোবের, ফাতি, আতিয়া এবং কোচ হোসাম হাসানকে হলুদ কার্ড দেখান ফরাসি রেফারি।
তবে সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস ইএসপিএরন এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, আতিয়ার ফাউলটি সরাসরি গোলের আক্রমণপর্বের অংশ ছিল বলে গোল বাতিল করা সঠিক ছিল। অন্যদিকে ম্যাক আলিস্টারের জার্সি টানা ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় তা পেনাল্টি দেওয়ার মতো ছিল না এবং সালাহ ফাউলের শিকার হওয়ার চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছিলেন।
তবে মাঠের সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তির এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও মিসরীয়দের ক্ষোভ থামাতে পারছে না। বিশ্বসেরা রেফারি হিসেবে ম্যাচে এসেও ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে তাই ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়লেন পক্ষপাতিত্ব ও অসঙ্গতির তীব্র তীর গায়ে মেখে।


