আগামী সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) পাশাপাশি সীমিত সংখ্যক হলেও নিজেদের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ডিসিদেরকে রিটার্নিং অফিসার করার দীর্ঘদিনের প্রথা থেকে সরে আসার এই প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে।
ইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য একজন কমিশনার ইসি কর্মকর্তাদের এই পদে নিয়োগের পক্ষে। তবে দুজন কমিশনার মনে করেন, মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের দক্ষতা এবং প্রভাবের কারণে ডিসিরা এই দায়িত্বের জন্য বেশি উপযুক্ত।
এছাড়াও, নির্বাচন চলাকালীন জটিলতা এড়াতে এই কমিশনাররা মনে করেন, ডিসিদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে এরপরেও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং কিছু জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে এই দায়িত্বে নিয়োগ করা যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইসি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে কোনো সমস্যা নেই। তবে, নির্বাচনের সময় যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয় তখন কী হবে?’
তিনি ডিসিদের নিয়োগের সুবিধা হিসেবে তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং জেলা পর্যায়ে অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করার ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ডিসিরা সুপ্রশিক্ষিত, যা ইসি কর্মকর্তারা নাও হতে পারেন। যদি সমন্বয়ের সমস্যা তৈরি হয়, তবে এর ফলাফল কী হবে?’
আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন সার্ভিস গঠন এবং একটি ক্যাডার কাঠামো তৈরি হলে ইসি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সমন্বয় ক্ষমতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে তাদের আরও কার্যকরভাবে এই ধরনের দায়িত্ব নিতে সাহায্য করবে।
এর আগে সংসদের উপ-নির্বাচনগুলোতে ইসি কর্মকর্তারা রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সাধারণ নির্বাচনে তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনের সময় মাঠ পর্যায়ে রিটার্নিং অফিসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। তারা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, বৈধতা নির্ধারণ এবং প্রতীক বরাদ্দসহ সম্পূর্ণ ভোট প্রক্রিয়ার তদারকি করেন। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে ডিসিদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়াই প্রশাসনের ঐতিহ্য।
তবে, বেশ কিছু রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে ডিসি নিয়োগে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেওয়ার দাবি করে আসছে। এই বছর, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামিসহ অন্যান্য দলও এই পরিবর্তনের জন্য তাদের দাবি নতুন করে তুলেছে। এছাড়াও, নির্বাচন সংস্কার কমিশন এই পদে ইসি কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইসি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশনের কাছে রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা পালনের জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা যুক্তি দেন, ইসি কর্মকর্তারা সফলভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং উপ-নির্বাচনগুলো পরিচালনা করেছেন।
তারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করা বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ এতে বিপুল সংখ্যক ভোটকেন্দ্র এবং প্রার্থী জড়িত থাকে। তাদের যুক্তি, যদি ইসি কর্মকর্তারা স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করতে পারেন, তবে জাতীয় নির্বাচন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
তাছাড়া, ডিসিদের নিয়োগ করা হলেও জাতীয় নির্বাচনের সামগ্রিক অপারেশনাল কাজ ইসি কর্মকর্তারাই সামলান। এরপরেও রিটার্নিং অফিসার হিসাবে ডিসিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের অনুযোগ।
ইসি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, কমিশন তার ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ১৯ জন জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মনির হোসেন বলেন, ‘৩০০ আসনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ইসির পর্যাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছে। আমরা অনুরোধ করেছি যে, সব রিটার্নিং অফিসার যেন ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। যদি ইসি কর্মকর্তাদের এই পদে নিয়োগ না দেওয়া হয়, তবে অ্যাসোসিয়েশন তাদের পরবর্তী কর্মপন্থা ঘোষণা করবে।’
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা নির্বাচনী আইন অনুসারে, কমিশন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একজন রিটার্নিং অফিসার এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করতে পারে।
ইসির তদারকি, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে রিটার্নিং অফিসার জেলার নির্বাচন সম্পর্কিত সমস্ত কার্যক্রম তদারকি এবং কমিশনের দেওয়া অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন। আইনে নির্দিষ্টভাবে ডিসিদেরকেই রিটার্নিং অফিসার করার কথা বলা নেই। কমিশন চাইলে যেকোনো যোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দিতে পারে।


