গুমের শিকার পরিবারে এখনো কান্না, বিচার নিয়ে সংশয়

কামরুজ্জামান খান
6 Min Read
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আলোচনা সভায় গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। ছবি: টাইমস
Highlights
  • বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘গুম শুধু বিএনপি বা জামায়াত নয়, ভিন্নমতের সবাই আক্রান্ত হয়েছেন। আইনের খসড়ায় আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি রয়েছে। ভুল হাতে আইন গেলে তা আবারও নির্যাতনের হাতিয়ার হতে পারে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মানুষ তুলে নেওয়া ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের। এসব নিখোঁজের অনেককেই আর ফিরে পাওয়া যায়নি; কারো কারো মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ছিলেন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী।

গুম কমিশনের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও আইনজীবীরা বলছেন, দেশে গুমের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সন্তোষজনক নয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। প্রস্তাবিত আইনে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হলেও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এতে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সোচ্চার হয়। এরপর সরকার তদন্ত শুরু করে এবং গঠন করে গুম কমিশন। কমিশনের অনুসন্ধানে খোঁজ মেলে একাধিক ‘আয়নাঘরের’; জমা পড়ে কয়েক হাজার অভিযোগ। এই প্রেক্ষাপটে উপদেষ্টা পরিষদ নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস (৩০ আগস্ট) উপলক্ষে শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের  জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সেখানে অংশ নেন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক নেতা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও গুম কমিশনের সদস্যরা।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনেরা জানিয়েছেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ বহু নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো হদিস মেলেনি।

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন মাইকেল চাকমা, কর্নেল হাসিনুর রহমান, ২০১৩ সালে মোহাম্মদপুর থেকে গুমের শিকার হাফেজ জাকিরের ভাই জিয়াউর রহমান, গুমের শিকার মো. আল আমিন ও তার স্ত্রী জেসমিন আরা বিউটি, আব্দুল বাসেত মারজান, রাজশাহী থেকে গুমের শিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মহিদুলের ভাই শহীদুল ইসলাম, ২০১৪ সালে নীলফামারী থেকে গুমের শিকার আতিকুর রহমানের ভাই আশিকুর রহমান, ২০১৭ সালে ধানমন্ডি থেকে নিখোঁজ হওয়া ইশরাক ফাহিমের বাবা জামাল উদ্দিন আহমেদ ও ভারত থেকে ফেরত আসা গুমের শিকার রহমাতুল্লাহ প্রমুখ।

মাইকেল চাকমা বলেন, ‘গুম কমিশন এখনো ভুক্তভোগীদের খোঁজ দিতে পারেনি। সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়ন হোক, ভবিষ্যতের সরকারও এ কার্যক্রম চালিয়ে যাক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে যেন আর কোনো সরকার গুমের চিন্তাও না করে।’

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস মন্তব্য করেন, ‘সিস্টেম পরিবর্তন ছাড়া গুম বন্ধ সম্ভব নয়। বাহিনীগুলোকে নন-লেথাল পদ্ধতিতে তথ্য আদায়ের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের পলিটিক্যাল স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার না করে, সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি নিতে হবে।’

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘গুম শুধু বিএনপি বা জামায়াত নয়, ভিন্নমতের সবাই আক্রান্ত হয়েছেন। আইনের খসড়ায় আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি রয়েছে। ভুল হাতে আইন গেলে তা আবারও নির্যাতনের হাতিয়ার হতে পারে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, ‘গুমের পরিবারগুলো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অনেকেই ব্যাংক হিসাব বা সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারছেন না। প্রস্তাবিত আইনে গুমের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল নেই। এ আইন যেন ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য নয় তা নিশ্চিত করতে হবে।’

মানবাধিকারকর্মী গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান লিটন, ‘আগামীর বাংলাদেশে গুম শব্দটাই যেন না থাকে। এজন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) সংস্কার করতে হবে। গত ১৫ বছরে যারা গুম ও খুনে জড়িত ছিলেন, তাদের তালিকা প্রকাশ ও বিচার করতে হবে।’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে আমরা এই গুম খুনের‌ সংস্কৃতিকে কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। একই সঙ্গে এ ধরনের সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, সেজন্য যত ধরনের আইনি, রাজনৈতিক এবং নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা করতে হবে‌।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের অঙ্গীকার। গুম-খুনের শিকারদের তালিকা করা হবে, পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’

এইচআরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান গুম প্রতিরোধে সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো—বাংলাদেশকে অবশ্যই জোরপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন (আইসিপিপিইডি) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া নিখোঁজদের সম্পর্কে তাদের পরিবারকে তথ্য জানাতে হবে এবং প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চলমান মামলা ও অভিযোগসমূহের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও স্থায়ী রূপ দিতে হবে। এ ছাড়াও গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য আইনি, আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান জরুরি। যারা দীর্ঘদিন ধরে গুমের শিকার, তাদের পরিবারের জন্য ভুক্তভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং বাহিনীর সকল সদস্যকে মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের নেতাকর্মীদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে এবং দলের নীতিমালা ও ইশতিহারে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ ছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমে মানবাধিকার, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুম বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করতে হবে।

Share This Article
Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *