র‍্যাপার থেকে মেয়র: নিউইয়র্কে আলোড়ন তোলা কে এই মামদানি?

র‍্যাপার থেকে মেয়র: নিউইয়র্কে আলোড়ন তোলা কে এই মামদানি?
স্ত্রী রামা দুয়াজির সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

নিউইয়র্কের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই ঝড় তুলেছেন তরুণ রাজনীতিক জোহরান মামদানি। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে সেখানকার প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়লেন তিনি। এক শতাব্দীর মধ্যে নিউইয়র্কের সবচেয়ে কমবয়সী মেয়রও তিনি। আর এর মধ্য দিয়ে র‍্যাপার থেকে পুরোদস্তর রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন ট্রাম্পবিরোধী এই ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি।

গত অক্টোবরে তিনি যখন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন, তখনও শহরের অধিকাংশ মানুষের কাছেই জোহরান মামদানি এক অচেনা নাম। কিন্তু কয়েক মাসেই জনহিতৈষী নির্বাচনি ইশতেহার দিয়ে তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। নিউইয়র্কের সেই তরুণরাই এবার ইসলাম ধর্মানুসারী মামদানির হাতে তুলে দিয়েছেন গোটা শহরের দায়িত্ব। যা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহরটির রাজনীতিতে এক বিস্ময়কর উত্থান।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মামদানির পরিবার

জোহরান মামদানির জন্ম উগান্ডার কাম্পালায়। তার বাবা-মা দুজনই ভারতীয় নাগরিক। মামদানির মা বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার। মনসুন ওয়েডিং, দ্য নেমসেক ও মিসিসিপি রিভারের মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রের পরিচালক তিনি। আর বাবা মাহমুদ মামদানি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী।

শৈশবের কিছু সময় দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে বেড়ে উঠেছেন তিনি। এরপর সাত বছর বয়সে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থায়ী হন।

২০১৮ সালে মামদানি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। এরপর সিরিয়ান-আমেরিকান শিল্পী রামা দুয়াজিকে বিয়ে করে কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় থিতু হন এই দম্পতি।

স্ত্রী রামা দুয়াজির সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: এপি/ইউএনবি

শিক্ষাজীবন

মামদানি ছিলেন ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্সের এক তুখোড় শিক্ষার্থী। স্কুলের প্রথম ক্রিকেট দল গঠন করে বন্ধুমহলে সবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে মেইনের বাউডইন কলেজ থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে স্নাতক শেষ করেন। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন নামক ফিলিস্তিনপন্থী ছাত্রসংগঠন, যা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থীদের মধ্যে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক

মা মীরা নায়ারের বদৌলতে ছোট থেকেই মিডিয়া পাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মামদানি। আগ্রহ জন্মায় সঙ্গীতে। পড়াশোনা ও কাজের পাশাপাশি তিনি র‍্যাপ সঙ্গীত শিল্পী ও গীতিকার হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইয়াং কার্ডামম’ নামে র‍্যাপ গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, পরে পরিচিত হন ‘মি. কার্ডামম’ নামে। ২০১৯ সালে দাদীর প্রতি উৎসর্গ করে লেখেন র‍্যাপ- ‘নানী’। মেয়র নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে তার এই র‍্যাপ গান ভাইরাল হয়ে যায়।

তবে ২০১৭ সালে তার প্রকাশিত ‘সালাম’- গানের কিছু লাইন রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে মামদানির কঠোর সমালোচনা করেছেন বিরোধীরা। তাদের দাবি, মামদানির চিন্তাভাবনা ‘অতি বামপন্থী ও বিতর্কিত’।

জোহরান মামদানি। ছবি: এপি/ইউএনবি

রাজনৈতিক উত্থান

আরও পড়ুন

রাজনীতিতে আসার আগে মামদানি কুইন্সে ‘ফোরক্লোজার প্রিভেনশন কাউন্সেলর’ হিসেবে কাজ করতেন। তার দায়িত্ব ছিল- মানুষকে গৃহচ্যুতি থেকে রক্ষা করা। এই অভিজ্ঞতাই তাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে টেনে আনে।

স্থানীয় পর্যায়ে কুইন্স ও ব্রুকলিনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রচারণায় কাজ করে মামদানি রাজনীতির মাঠে প্রথম সক্রিয় হন। ২০২০ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি ‘নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য’ নির্বাচিত হন। অনভিজ্ঞ রাজনীতিক হলেও সেবার তিনি দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন।

মামদানি নিজেকে ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেও বিভিন্ন সময় ডেমোক্র্যাট শিবিরের অনেক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও ইসরায়েলপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে নিউইয়র্কবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছেন। তার সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবনা ছিল- শহরের কিছু বাস সার্ভিসকে এক বছরের জন্য ‘ভাড়া-মুক্ত প্রকল্প’ হিসেবে চালু করা।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এনজিওকে ‘ইসরায়েলি বসতি স্থাপনে অনুমোদনহীন সহায়তা’ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বিল প্রস্তাব করেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন তিনি।

ভাইরাল প্রচারণা

ভোটের মাঠে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও ট্রাম্প সমর্থিত অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে পরাস্ত করতে অভিনব প্রচারে নামেন মামদানি ও তার সমর্থকরা।

বলিউডের ধাঁচে নিউইয়র্কের রাস্তাঘাট, আর হাস্যরসের মিশেলে রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে তার প্রচার ভিডিওগুলো তৈরি করা হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহারের নতুন ফ্রিজ কেনায় অনুৎসাহিত করতে ‘ফ্রিজ ভাড়া’-দেওয়ার পরিকল্পনা চমকপ্রদ উপায়ে সবার কাছে পৌঁছে দিতে নিউ ইয়ার ডে-তে স্যুট বুট পরে তিনি ঝাঁপ দিয়েছেন কনি আইল্যান্ডের বরফঠান্ডা পানিতে।

জোহরান মামদানি। ছবি: এপি/ইউএনবি

নির্বাচনি প্রচারের শেষ সপ্তাহে তিনি পায়ে হেঁটেছেন গোটা ম্যানহাটন। ১৩ মাইলের সেই পথ পাড়ি দেওয়ার সময় নানা বয়সের, পেশার, ধর্মের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সেসব ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জনগণের আরও কাছে এসেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অ্যাপ টিকটকেও তুমুল প্রচার চালান এই তরুণ রাজনীতিক। ওই প্ল্যাটফর্মে কখনও বাংলায়, কখনও স্প্যানিশে, আবার কখনও আরবিতে কথা বলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন নানা সম্প্রদায়ের কাছে।

ভিন্নধর্মী নির্বাচনি ইশতেহার

মামদানির নির্বাচনি ইশতেহারের মূল কথা— ‘নিউইয়র্ক যেন শুধু ধনীদের শহর হয়ে না থাকে’। শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, আগামী ১০ বছরে দুই লাখ সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন ইউনিট নির্মাণ, বাস ভাড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মুদি দোকান স্থাপন করে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার, বড় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি কর আরোপের মাধ্যমে শিক্ষা, শিশুর যত্ন ও সামাজিক সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, পুলিশ-নির্ভরতা কমিয়ে সামাজিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক নিরাপত্তা উদ্যোগ জোরদার করার মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মামদানি।

তার এই প্রগতিশীল ভাবনা তাকে দলের বামপন্থী শাখার প্রিয় মুখ করে তুলেছে। সমর্থন পেয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ ও সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো জনপ্রিয় প্রগতিশীল নেতাদের কাছ থেকে।

জোহরান মামদানি। ছবি: এপি/ইউএনবি

ফিলিস্তিন ইস্যু ও বিতর্ক

শিয়া মুসলিম জোহরান মামদানি ফিলিস্তিনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি সমালোচনাও কম হয়নি। তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘ইসরায়েল যেন কেবল ইহুদি রাষ্ট্র না হয়। সেখানে সব ধর্মের অনুসারীদের সমান অধিকার থাকতে হবে।’ নিউইয়র্কে আট লাখ মানুষের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী তার এই বক্তব্যে উৎসাহিত হলেও, কিছু ইহুদি সংগঠন ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে আখ্যা দেন।

নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি 

বেসরকারি ফলে জয় পাওয়ার পর দেওয়া এক ভাষণে মামদানি বলেন, ‘আমি আমার বিশ্বাস বা মানবতার প্রতি অঙ্গীকার ও দায়িত্ব কখনোই পরিত্যাগ করব না। তবে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- যাদের সঙ্গে আমার মতভেদ আছে, আগ্রাসী না হয়ে তাদের কথাও মনোযোগ দিয়ে শুনব, বুঝব, এবং আন্তরিক সংলাপে বসব।’

নিউইয়র্কের বহু বর্ষীয়ান কূটনৈতিক বিশ্লেষক তার বক্তব্যে মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিশ্লেষক ল্যু জেনি বলেন, ‘মামদানির জীবন যেন সিনেমা। চলচ্চিত্র নির্মাতার সন্তান, সাবেক র‍্যাপার, সমাজকর্মী… আর এখন শহরের মেয়র পদে আসীন এক মুসলিম ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ। তিনি এক নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি, তরুণ এবং ডিজিটাল যুগের রাজনীতিক।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর