যুদ্ধের ছয় মাসেও প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা খামেনি

যুদ্ধের ছয় মাসেও প্রকাশ্যে আসেননি  মোজতবা খামেনি
মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ ছয় মাসে পা দিলেও দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসেননি। যুদ্ধের শুরুতেই ওই বিমান হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়া মোজতবার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তাও প্রকাশ করা হয়নি।

এতে ইরানের নেতৃত্ব ও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে।

ইরানি কর্মকর্তা ও দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি সূত্রের দাবি, নিরাপত্তার কারণে আড়ালে থেকেই দেশ পরিচালনা করছেন মোজতবা। গুরুতর আঘাতে তার চেহারা বিকৃত হয়েছে এবং তিনি চিকিৎসা ও সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।

প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে ছেড়ে দিলেও গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তে তার চূড়ান্ত অনুমোদন রয়েছে বলে দাবি তাদের।

তবে ইরানের মত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্যকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে দেখা হয়, সেখানে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে সংশয় বাড়ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, প্রশ্নটি এখন আর মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা নয়; বরং ইরানের কার্যকর সর্বোচ্চ নেতা আদৌ আছেন কি না, সেটিই প্রশ্ন।

কণ্ঠস্বরও শোনা যায়নি

ইরানের জনগণের উদ্দেশে মোজতবার এখন পর্যন্ত একমাত্র বার্তা এসেছে কয়েকটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উপস্থাপকেরা সেগুলো পড়ে শুনিয়েছেন। গত মাসে তার বাবার মৃত্যুর পর আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ সপ্তাহব্যাপী জানাজা ও শোকানুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায়নি।

শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় তাকে প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। তাদের দাবি, মোজতবা নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিবেদন পাচ্ছেন এবং বড় সিদ্ধান্তগুলোতে শেষ কথা বলছেন।

গত ১০ আগস্ট ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেন, তিনি মোজতবার সঙ্গে সাত ঘণ্টা বৈঠক করেছেন।

তবে সরকারের কট্টরপন্থী সমর্থকদের মধ্যেও সংশয় তৈরি হচ্ছে। কোম শহরের এক বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী সদস্য বলেন, দেশের নেতৃত্বে মোজতবা আছেন, এ বিষয়ে মানুষের আস্থা বাড়াতে তার কণ্ঠ শোনা বা অন্তত তার উপস্থিতির কোনো প্রমাণ দেখা প্রয়োজন।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু তার একটি ছবিও প্রকাশ না পাওয়ায় মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সংস্কারপন্থী ও সরকারবিরোধীদের সংশয় আরও তীব্র। তেহরানের এক ব্যবসায়ী শাহরোখ বলেন, মোজতবা নিহত হননি—এমন প্রমাণই বা কোথায়? তিনি বেঁচে আছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত, এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকা যুক্তিসংগত নয়।

ক্ষমতার কেন্দ্রে রেভল্যুশনারি গার্ড

ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষগুলোর সঙ্গে লড়াই করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়লেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো টিকে আছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে সক্ষম।

শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের ক্ষয়ক্ষতির পরও ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো সচল রাখতে পেরেছে। তবে দীর্ঘ সংঘাত ও কয়েক মাস ধরে তেল রপ্তানিতে অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে। তীব্র হয়েছে রিয়ালের দরপতন।

এতে জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক প্রাণহানির পর আবারও গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে শাসকগোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা, সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানো।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাব আরও বেড়েছে। সূত্রগুলো বলছে, পুনর্গঠিত ক্ষমতার কাঠামোয় সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে আইআরজিসি এখন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই ক্ষমতাকেন্দ্রে আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন।

ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মোজতবা ওই শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন এবং সব বড় সিদ্ধান্তে তার চূড়ান্ত অনুমোদন রয়েছে।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, খুব অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা সরাসরি মোজতবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন। তার শারীরিক অবস্থান বা অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না, কারণ তা ফাঁস হলে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান শনাক্ত করে হামলা চালাতে পারে।

তার ঘনিষ্ঠ মহলের একজনের দাবি, মোজতবার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, সব চাপের মধ্যেও জনগণের জন্য সরকারি সেবা বন্ধ হয়নি, পররাষ্ট্রনীতিতে ঐক্য বজায় রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা আছে। তার মতে, এসবই প্রমাণ করে সর্বোচ্চ নেতা এখনও দেশ পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণ রাখছেন।

প্রকাশ্যে না আসার মূল্য কতখানি?

যুদ্ধের আগেও মোজতবা ছিলেন অনেকটাই আড়ালের মানুষ। বাবার প্রধান সহযোগী হিসেবে তিনি পর্দার আড়ালেই থাকতে পছন্দ করতেন এবং জনসম্মুখে খুব কমই আসতেন।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার পর মোজতবার নিজেরও গুরুতর আঘাত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইরানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তাদের দাবি, ওই আঘাতে তার মুখ বিকৃত হয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের সবচেয়ে বড় সংকটের সময়ে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তি করতে হলে মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তার অনুমোদন অপরিহার্য।

তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী দাবি করতে পারে যে তারা জানে সর্বোচ্চ নেতা আসলে কী চান।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad