গোপনে যে বিমানে উঠেছিলাম তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল: ট্রাম্প

গোপনে যে বিমানে উঠেছিলাম তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

ইরানের হত্যার হুমকির কারণে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন থেকে দেশে ফেরার পথে গোপনে বিমান পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ও নিরাপত্তা এজেন্টদের নির্দেশনা মেনেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলি। তারা চেয়েছিল আমি অন্য একটি ফ্লাইটে, অন্য একটি বিমানে যাই। তারা যা বলে, আমাকে সেটাই করতে হয়।’

বিবিসির খবরে বলা হয়, গত ৮ জুলাই তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে নির্ধারিত এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা গেলেও পরে একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকের সহায়তায় তাকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ইরানের ঘোষিত সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে তার বিমান পরিবর্তন করা হয়েছিল —এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে মুখ খুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

শেষ মুহূর্তে বিমান পরিবর্তনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ‘ছদ্মবেশী’ মূল বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ অন্য সফরসঙ্গীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল কি না। তবে সে প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি যে সামরিক বিমানে উঠেছিলেন, সেটিই বরং ‘আরও বেশি ঝুঁকির’ মধ্যে ছিল।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে ইরানি হুমকির তথ্য পেয়েছিল।

এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছে এমন তথ্য ছিল যে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের কাছাকাছি এলাকায় এক ব্যক্তিকে কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ দেখা গিয়েছিল। এরপরই মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা তড়িঘড়ি করে ট্রাম্পকে নির্ধারিত বিমান থেকে সরিয়ে নেন।

তবে সম্ভাব্য ইরানি হুমকি মোকাবিলায় ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তাকে জানানো হয়নি। বরং তারা জানতেন প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গে একই বিমানে ভ্রমণ করছেন।

এর আগে আঙ্কারায় সম্মেলন চলাকালে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইরানের হত্যা তালিকায় ‘এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু’।

মঙ্গলবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ধারণা, সেদিন কোনো একটি হুমকি ছিল। আমি আসলে এ বিষয়ে খুব বেশি প্রশ্ন করিনি। আমি প্রতিনিয়তই এমন অনেক হুমকি পাই।’

‘আমার বিরুদ্ধে এমন অনেক হুমকি আছে, যেগুলো সম্পর্কে আপনারা জানেনই না’, যোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প কাতারের রাজপরিবারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে করে তুরস্কে গিয়েছিলেন। তবে পরে তিনি ঘোষণা দেন, ‘পুরোনো দিনের স্মৃতির কথা ভেবে’ তিনি আগের এয়ার ফোর্স ওয়ানেই দেশে ফিরবেন।

এয়ার ফোর্স ওয়ানের বিপরীত পাশে দরজার সমান উচ্চতায় তোলা হয় খাবারবাহী ট্রাক। ছবি: এপি/ইউএনবি

৮ জুলাই প্রকাশিত ভিডিওতে ট্রাম্পকে আঙ্কারা বিমানবন্দরে তার আগের এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটিতে উঠতে দেখা যায়। তবে ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পরে গোপনে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নেমে একটি খাবার সরবরাহকারী (ক্যাটারিং) ট্রাকে ওঠেন। ট্রাকটি বিমানের বিপরীত পাশে দরজার সমান উচ্চতায় তোলা হয়েছিল।

এরপর তাকে গোপনে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সি-৩২এ সামরিক বিমানে নেওয়া হয়। এটি মূলত বোয়িং ৭৫৭ মডেলের সামরিক বিমান যা প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টকে বহনে ব্যবহার করা হয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটটিকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আলাদাভাবে বাইরের সিঁড়ি ব্যবহার করে নির্ধারিত সি-৩২এ বিমানে ওঠেন।

অন্যদিকে সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তারা তখনও জানতেন না- প্রেসিডেন্ট আর ওই বিমানে ছিলেন না।

বিমানটিতে থাকা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদলের একজন জানান, জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশটি তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল।

একজন আলোকচিত্রী অল্প সময়ের জন্য জানালার পর্দা খুললে তাকে দ্রুত সেটি আবার বন্ধ করতে বলা হয় বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংবাদকর্মীরা বিমানটির কাছে পৌঁছানোর সময় সামনের ও পেছনের উভয় দিকেই দুটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাক দেখা গিয়েছিল বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরে গাড়িবহরে সাংবাদিকদের গাড়িটি এতটাই পেছনে ছিল যে প্রেসিডেন্টের বিমানে ওঠার ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।

প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী যেকোনো বিমানের পরিচিতি সংকেতই ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’।

কিন্তু ওই ঘটনায় ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ বিমানটি ‘রিচ ১৮’ পরিচিতি সংকেত ব্যবহার করে। অন্যদিকে সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানটি ছদ্মবেশ ধরে রাখতে ‘এএফ১’ পরিচিতি সংকেত ব্যবহার করতে থাকে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যও মূল বিমানেই ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ওই বিমানে ছিলেন।

এরপর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং বিমানটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স মিলডেনহলে অবতরণের পর ওই বিমান থেকে তাকে নামতে দেখা যায়।

তবে সি-৩২এ বিমান থেকে কীভাবে তাকে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে তোলা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।

এরপর ওয়াশিংটনে ফেরার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট কাতারের দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন এবং ওই ফ্লাইটে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। সেখানে তিনি ইরানের হুমকির কথা উল্লেখ করলেও বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি জানাননি।

এদিকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটির আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক হোসে জামোরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অনুসরণ করে সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিপদের মুখে ফেলা না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে সাংবাদিকদের জানানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর